বাবা-মায়ের কবরের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলার দাতা হাতেমতাই নামে খ্যাত সাবেক স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান প্রতিমন্ত্রী ও মুন্সিগঞ্জ জেলা বিএনপির আহবায়ক মিজানুর রহমান সিনহা। তার মরদেহ সোমবার উপজেলার কলমা ইউনিয়নের ডহুড়ী গ্রামে বাবা-মায়ের কবরের পাশেই পরিবারিক কবরস্হানে সমাহিত করা হয়েছে।
লৌহজংয়ের কলমা স্কুল মাঠে বাদ আছর ৬ষ্ঠ নামাজে জানাজা শেষে তাঁকে কলমার নিজ বাড়িতে পারিবারিক কবর স্থানে বাবা-মায়ের কবরের পাশে দাফন করা হয়।
তার নামাজে জানাজায় মুন্সিগঞ্জ-২ আসনের সাংসদ ও বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব এড. আব্দুস সালাম আজাদ, লৌহজং উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সহ জেলা ও উপজেলা এবং সকল ওয়ার্ডের নেতা কর্মীরস উপস্হিত ছিলেন।
সাবেক স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ও মুন্সিগঞ্জ জেলা বিএনপির আহবায়ক মিজানুর রহমান সিনহা গত শুক্রবার দিবাগত রাত ২ টার দিকে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। সিঙ্গাপুর থেকে রবিবার ভোর রাতে তার মরদেহ দেশে এসে পৌছে। ১৭ মে রোববার বেলা ১১টার তাঁর প্রথম নামাজে জানাজা জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিন প্লাজায় অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় জানাজা বাদ জহুর তাঁর ধামরাইয়ের ফ্যাক্টরী প্রঙ্গনে অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং বাদ আছর তৃতীয় নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে ঢাকার শ্যামলী ক্লাব মাঠ প্রাঙ্গনে। ১৮ মে সোমবার বেলা ১০টার তাঁর ৪র্থ নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়ে বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে পল্টনে। এর পর সোমবার বেলা ১২টায় মুন্সিগঞ্জের লৌহজংয়ে মালির অংক মাঠে তাঁর ৫ম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সর্বশেষ সোমবার বাদ আছর কলমা হাই স্কুল মাঠে ৬ষ্ঠ নামাজে জানাজা শেষে তাঁর জন্মস্থান লৌহজংয়ের কলমার সিনহা হাউজের পারিবারিক কবর স্থানের বাবা-মায়ের কবরের পাশে তাকে চিরশায়িত করা হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। তিনি স্ত্রী, এক ছেলে তানভীর সিনহা ও মেয়ে তাসনিম সিনহা স্নিগ্ধাকে রেখে মারা গেছেন। এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন লৌহজং উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব মো. হাবিবুর রহমান অপু চাকলাদার।
রাজনীতির দীর্ঘ পথচলায় মিজানুর রহমান সিনহা বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির কোষাধ্যক্ষ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ২০২০ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালীন তিনি রাজনীতি ছেড়ে দেয়ার ঘোষণা দেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে সবশেষ ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে তিনি মুন্সিগঞ্জ জেলা বিএনপির আহবায়ক হিসেবে দায়িত্বভাট গ্রহন করেন। তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মুন্সিগঞ্জ-২(লৌহজং-টঙ্গীবাড়ি) আসন হতে দলীয় মননোয়ন লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁর স্থলে বিএনপি’র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. আব্দুস সালাম আজাদকে এ আসনে দলীয় মননোন দেয়া হয়।
মিজাননুর রহমান সিনহা এলাকায় একজন দানবীর বা দাতা হাতেমতাই হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসা-মসজিদ, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, গরীব ছেলে-মেয়েদের বিয়ে সাদীতে দান করার ব্যাপক নজীর রয়েছে তার। মোট কথা তাঁর কাছে কেউ সাহায়্যের জন্য গেলে সে কখনও খালি হাতে ফিরে আসেনি।
মিজানুর রহমান সিনহা ১৯৪৩ সালের ১৮ আগস্ট মুন্সিগঞ্জ জেলার লৌহজং উপজেলার কলমা ইউনিয়নের ডহুরী গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। তাঁর স্থানীয় বাড়ি ‘সিনহা হাউজ’ দীর্ঘদিন ধরে দর্শনীয় স্থান হিসেবে সকলের জন্য উন্মুক্ত।
তাঁর পিতার নাম হামিদুর রহমান সিনহা ও মাতার নাম নূরজাহান সিনহা। হামিদুর রহমান বাংলাদেশের ঔষধ ব্যবসায়ের অন্যতম পথিকৃৎ ও শিল্পগোষ্ঠী একমি গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা। মিজানুর রহমান সিনহা শৈশবে কলকাতায় বেড়ে উঠেন। পরবর্তীতে নারায়ণগঞ্জের সরকারি তোলারাম কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় স্নাতক সম্পন্ন করেন।
১৯৬৪ সালে সিনহা হাবিব ব্যাংকে চাকুরীর মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। তাঁর পিতার মৃত্যুর পর ১৯৭৫ সালে তিনি পিতার প্রতিষ্ঠিত একমি গ্রæপে যোগদান করেন। ১৯৮৩ সাল থেকে তিনি গ্রুপটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছিলেন।
মিজানুর রহমান সিনহা ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সাথে যুক্ত হন। সরকারি তোলারাম কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি ছাত্র ইউনিয়নের প্রার্থী হিসেবে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৯০ সালের মিজানুর রহমান সিনহা বিএনপিতে যোগদান করেন। পরবর্তীতে তিনি দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির কোষাধ্যক্ষ হিসেবে ২২ জানুয়ারি ২০২০ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি বিএনপির মনোনয়নে মুন্সিগঞ্জ-২ আসন থেকে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে দু’বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মরহুম নূজরুল ইসলাম খান বাদলকে পরাজিত করে বিজয় অর্জন করেন। এরপর ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রাার্থী সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলিকে হারিয়ে পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। রাজনৈতিক কর্মকান্ডের পাশাপাশি সামাজিক উন্নয়ন, জনকল্যাণমূলক কাজ ও দানশীলতার জন্যও এলাকায় ব্যাপক পরিচিত ছিলেন মিজানুর রহমান সিনহা।
তাঁর মৃত্যুতে এলাকার জনগণ ও বিএনপি’র রাজনীতিক নেতা-কর্মীসহ এলাকার সাধারণ জনগনের মাঝে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাই মিজানুর রহমান সিনহাকে সর্বশেষ এক নজর দেখতে তাঁর প্রতিটি জানাযায় এলাকার শত শত লোক অংশ গ্রহন করেন।
মন্তব্য করুন
Design & Developed by: BD IT HOST