চট্টগ্রাম: সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সরকার কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করবে না বলে আশ্বস্ত করেছেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী। তিনি বলেছেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি। তাই সাংবাদিকরা যেন নির্ভয়ে, বস্তুনিষ্ঠভাবে এবং পেশাগত দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করতে পারেন, সে পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একই সঙ্গে তিনি অপতথ্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সংবাদ পরিবেশনে সত্যতা, নিরপেক্ষতা ও পেশাগত মান বজায় রাখা এখন সময়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
শুক্রবার দুপুরে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব ভবনের দ্বিতীয় তলায় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়ন (সিএমইউজে)-এর নতুন কার্যালয়ের উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তথ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিএনপি অতীতেও সাংবাদিকদের অধিকার ও কল্যাণে কাজ করেছে এবং বর্তমানেও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময় সাংবাদিকবান্ধব বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল। বর্তমান সরকারও সাংবাদিকদের ন্যায্য অধিকার, পেশাগত নিরাপত্তা এবং কল্যাণমূলক বিষয়গুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।
তিনি বলেন, “আমরা দেখেছি অতীতে সংবাদ প্রকাশ ও মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছিল। সাংবাদিকদের ওপর চাপ প্রয়োগ, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং পেশাগত কাজে হস্তক্ষেপের অভিযোগও ছিল। কিন্তু বর্তমান সরকারের সেই ধরনের কোনো মানসিকতা নেই। আমরা বিশ্বাস করি, গণমাধ্যম তার নিজস্ব গতিতে চলবে এবং সাংবাদিকরা স্বাধীনভাবে কাজ করবেন।”
ইয়াসের খান চৌধুরী আরও বলেন, “এখন পর্যন্ত কোনো সংবাদ প্রকাশের জন্য সরকার চাপ প্রয়োগ করেছে—এমন অভিযোগ কেউ করতে পারবে না। আমরা চাই গণমাধ্যম দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করুক এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো জনগণের সামনে সঠিকভাবে তুলে ধরুক।”
গণমাধ্যমে বস্তুনিষ্ঠতার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, “স্বাধীনতার পাশাপাশি দায়িত্ববোধও গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিকদের এমনভাবে কাজ করতে হবে যাতে অপতথ্য, গুজব বা অসত্য তথ্য সংবাদে স্থান না পায়। কারণ একটি ভুল তথ্য সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে এবং মানুষের আস্থার জায়গাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।”
বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে উদ্বেগের কথাও উল্লেখ করেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, “এআই প্রযুক্তি যেমন নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে, তেমনি এর অপব্যবহারের ঝুঁকিও বেড়েছে। বর্তমানে ছবি, ভিডিও ও বিভিন্ন ডিজিটাল কনটেন্ট বিকৃত করে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া সহজ হয়ে গেছে। ফলে সাংবাদিকদের তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে আরও বেশি সতর্ক ও দায়িত্বশীল হতে হবে। তবে এআইয়ের ইতিবাচক ব্যবহারও রয়েছে, যা সাংবাদিকতাকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করতে সহায়তা করতে পারে।”
সাংবাদিকদের আর্থিক ও পেশাগত নিরাপত্তার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন তিনি। বলেন, “সারাদেশের মতো চট্টগ্রামের সাংবাদিকদের অধিকার ও কল্যাণের বিষয়েও সরকার গুরুত্বসহকারে কাজ করবে। অতীতে সাংবাদিকদের জন্য যেসব আবাসন সুবিধা ও কল্যাণমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল, সেগুলোর বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। সাংবাদিকদের জীবনমান উন্নয়নেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
তিনি জানান, সম্পাদক পরিষদ প্রধানমন্ত্রীর কাছে তাদের বকেয়া পাওনা পরিশোধের দাবি জানিয়েছে এবং সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি গণমাধ্যম মালিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, সাংবাদিকদের বেতন-ভাতা যেন নিয়মিত ও সময়মতো পরিশোধ করা হয়।
“অনেক সাংবাদিক আমার কাছে এসে বেতন বকেয়া থাকার অভিযোগ করেন। একজন সাংবাদিক যদি দীর্ঘদিন বেতন না পান, তাহলে তার পক্ষে পেশাগত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই সাংবাদিকদের ন্যায্য প্রাপ্য নিশ্চিত করা জরুরি,” বলেন তিনি।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধক ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার যৌক্তিক সমালোচনাকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করছে এবং সেই অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে।
তিনি বলেন, “দেশ পরিচালনায় যেমন সবার সহযোগিতা প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন গঠনমূলক সমালোচনা। কারণ সমালোচনার মাধ্যমেই ভুল-ত্রুটি চিহ্নিত করা সম্ভব হয়। গণমাধ্যম সমাজ ও রাষ্ট্রের আয়না হিসেবে কাজ করে। তাই সাংবাদিকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা রাষ্ট্র পরিচালনায়ও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।”
মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন আরও বলেন, যারা দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ঠা, সততা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে সাংবাদিকতা করে আসছেন, তাদের অবদানকে যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে। পাশাপাশি সাংবাদিক সমাজের মধ্যে ঐক্য ও পেশাগত সংহতি আরও শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মোহাম্মদ শাহনওয়াজের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক সালেহ নোমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এ অনুষ্ঠানে বিভিন্ন গণমাধ্যম, পেশাজীবী ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ওবায়দুর রহমান শাহীন, চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সভাপতি জাহিদুল করিম কচি, দৈনিক আজাদীর সম্পাদক এম এ মালেক, ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিলের সদস্য ওসমান গনি মনসুর, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. নুরুল কবির, চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মো. জানে আলম, ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক ডা. আবু নাসের, কালের কণ্ঠের ব্যুরো প্রধান মুস্তাফা নঈম, চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মওলা মুরাদ, চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ তারেক আহমদ, সিএমইউজের সদস্য আমিনুল ইসলাম, বাসসের সিনিয়র রিপোর্টার মিয়া মো. আরিফ এবং দৈনিক আমার দেশের চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান সোহাগ কুমার বিশ্বাস।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত সাংবাদিকরা আবাসন সংকট, বেকার সাংবাদিকদের কর্মসংস্থান, ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন, গণমাধ্যম খাতের আর্থিক সংকট এবং সাংবাদিকদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন। তারা এসব সমস্যা সমাধানে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ কামনা করেন। বক্তারা বলেন, সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বস্তুনিষ্ঠতা আরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
এর আগে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী এবং ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন ফিতা কেটে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়নের নতুন কার্যালয়ের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে সংগঠনের সদস্য মো. হোসেন পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করেন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়নের নতুন কার্যালয় সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার আদায়, সাংগঠনিক কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং সাংবাদিক সমাজের ঐক্য সুদৃঢ় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে এ আয়োজন সাংবাদিকদের দীর্ঘদিনের বিভিন্ন দাবি ও প্রত্যাশার বিষয়গুলোকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
মন্তব্য করুন
Design & Developed by: BD IT HOST