প্রশাসনিক নজরদারি এড়াতে ভুয়া ঠিকানা ও অস্তিত্বহীন ব্র্যান্ডের মোড়ক ব্যবহার করে পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলায় অবাধে চলছে অনুমোদনহীন আইসক্রিম ও বিষাক্ত ভেজাল শিশু খাদ্যের ব্যবসা। উপজেলার উত্তর-পশ্চিম সোহাগদল গ্রামে জরাজীর্ণ টিনশেড ঘরে চরম নোংরা পরিবেশে তৈরি হচ্ছে এসব চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ পণ্য।
অনুসন্ধানে জানা যায়, উত্তর-পশ্চিম সোহাগদল গ্রামে (এনডব্লিউ) মাদরাসার পাশে বিএসটিআই কিংবা পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো ছাড়পত্র ছাড়াই চলছে ‘লুচি আইসক্রিম ফ্যাক্টরি’। সেখানে অননুমোদিত কৃত্রিম রং, নামহীন ক্ষতিকর কেমিক্যাল ও বিষাক্ত উপাদান মিশিয়ে তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন আইসক্রিম ও শিশু খাদ্য।
সরেজমিনে দেখা যায়, প্রস্তুতকৃত পণ্যের গায়ে উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ কিংবা নির্ধারিত মূল্যের কোনো উল্লেখ নেই। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার চোখ ফাঁকি দিতে এসব পণ্যের গায়ে পটুয়াখালীর ‘নিউ নন্দিনী’ ও ‘হেতালিয়া’ এবং বাগেরহাটের ভুয়া নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে ‘সাদ আইসক্রিম’-এর চকবার, কোকোনাট, নছিলা ও ক্যাটবেরী আইসক্রিম তৈরি করা হচ্ছে। এছাড়া শিশুদের আকৃষ্ট করতে ‘রোবট’, ‘দধি’ ও ‘স্পিড’ নামের ক্ষতিকর শিশু খাদ্য বাজারে ছাড়া হচ্ছে।
শুধু তাই নয়, জালিয়াতির অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে যে, পাশের নাজিরপুর উপজেলার জয়পুর গ্রামের ‘আশা ফুড প্রোডাক্টস’-এর মোড়ক ব্যবহার করে ক্ষতিকর শিশু খাদ্য বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। অথচ বাস্তবে নাজিরপুরের জয়পুর গ্রামে এমন কোনো কারখানার অস্তিত্বই নেই!
স্থানীয় তৌহিদ নামের এক সরবরাহকারী জানান, “এই আইসক্রিম ও শিশু খাদ্যগুলো সোহাগদল গ্রামের আবুল হোসেনের কারখানা থেকেই তৈরি হয়। আমি শুধু এগুলো কিনে বিভিন্ন হাট-বাজার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনের দোকানগুলোতে সরবরাহ করি।” “৫নং ওয়ার্ডের মোঃ জহিরুল ইসলাম জানান, তিনিও একসময় এই ফ্যাক্টরি পন্য বাজারজাত করতেন এখন তিনি অন্য ব্যবসায় চলে গেছেন।”
অবৈধ ব্যবসার কথা স্বীকার করে কারখানার মালিক আবুল হোসেন বলেন, “আমার কারখানার কোনো সরকারি অনুমোদন নেই, পণ্যের নির্দিষ্ট কোনো বৈধ মোড়কও নেই। ছোটখাটোভাবে কারখানাটি চালাচ্ছি, আমার ভুল হয়ে গেছে।”
এদিকে নাজিরপুরের নাম ব্যবহার করায় ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয় বরফ কলের মালিক ফুয়াদ বলেন, “আমাদের এলাকার নাম ব্যবহার করে ভুয়া মোড়কে অবৈধ শিশু খাদ্য বিক্রি করা স্পষ্ট আইনি অপরাধ। এভাবে জালিয়াতি করে জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে ফেলা হচ্ছে। অবিলম্বে এই প্রতারক চক্রকে চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।”
অস্বাস্থ্যকর ও বিষাক্ত উপাদান দিয়ে তৈরি এসব পঁচা-বাসি খাদ্য খেয়ে শিশুরা পেটের পীড়া, ডায়রিয়া, কাশিসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয় অভিভাবকদের। সচেতন মহল জরুরি ভিত্তিতে এই কারখানা সিলগালা করার দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে নেছারাবাদ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আশিক আহম্মেদ জানান, “অনুমোদন ছাড়া ও ভুয়া মোড়কে শিশু খাদ্য তৈরি করা গুরুতর অপরাধ। সুনির্দিষ্ট নাম-ঠিকানা পাওয়া গেছে, দ্রুত সরেজমিনে অভিযান চালিয়ে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
কোমলমতি শিশুদের জীবন রক্ষায় এবং জনস্বার্থে অবিলম্বে উক্ত এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালত (মোবাইল কোর্ট) পরিচালনা করে কারখানাটি সিলগালা ও জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছে স্থানীয়রা।
মন্তব্য করুন
Design & Developed by: BD IT HOST