চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও ভূমিদস্যুতার প্রভাববলয় সম্পূর্ণ ভেঙে সেখানে রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, জঙ্গল সলিমপুরে আর কোনো সন্ত্রাসী চক্র বা অপরাধী গোষ্ঠীর ঘাঁটি থাকতে দেওয়া হবে না। রাষ্ট্রের আইন, প্রশাসন ও সাংবিধানিক কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করার যেকোনো অপচেষ্টা কঠোরভাবে দমন করা হবে।
৩১ মে (রবিবার) সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকা সরেজমিন পরিদর্শন শেষে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির, বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. মনিরুজ্জামান, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা এবং পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বিপিএমসহ ঊর্ধ্বতন প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিগত ১৭ বছরের রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রের ভেতরে এক ধরনের ‘দুর্বৃত্ত কাঠামো’ তৈরি হয়েছিল, যার একটি দৃশ্যমান উদাহরণ জঙ্গল সলিমপুর। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর চট্টগ্রামে একাধিক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে ব্যবসায়ীদের বাসভবনে সশস্ত্র হামলা, গুলিবর্ষণ ও চাঁদা আদায়ের ঘটনা গভীরভাবে পর্যালোচনা করে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে। এর ধারাবাহিকতায় গত ৯ মার্চ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে বিশেষ যৌথ অভিযান পরিচালিত হয়।
তিনি জানান, জঙ্গল সলিমপুরে সিসিটিভি ক্যামেরা, পাহারা ও নিজস্ব নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে অপরাধী চক্র একটি সমান্তরাল নিয়ন্ত্রণ কাঠামো গড়ে তুলেছিল। যৌথ অভিযানে সেই অবৈধ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার বড় অংশ ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে তথ্য ফাঁসের কারণে অভিযানের পূর্ণ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হয়নি। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে এবং এর সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করা হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, রাষ্ট্রীয় স্থাপনাকে লক্ষ্য করে র্যাবের নির্মাণাধীন ক্যাম্প বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলার ঘটনা অত্যন্ত গুরুতর। এ ঘটনার পেছনে কারা জড়িত, কারা ইন্ধন দিয়েছে এবং কোন ভূমিদস্যু চক্র সক্রিয় ছিল তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কোনো অবস্থাতেই রাষ্ট্রবিরোধী শক্তিকে ছাড় দেওয়া হবে না বলে তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আমরা জনগণের সরকার, জনগণের নিরাপত্তাই আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।” যারা বিভিন্ন বাস্তবতায় এখানে বসবাস করছেন, তাদের কাউকেই আপাতত উচ্ছেদ করা হবে না। তবে প্রকৃত বাসিন্দাদের জন্য একটি মানবিক ও টেকসই পুনর্বাসন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। তিনি গুজব ও বিভ্রান্তি থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানান।
তিনি আরও জানান, সলিমপুর ইউনিয়নকে কেন্দ্র করে সীতাকুণ্ড, ভাটিয়ারী-হাটহাজারী লিংক রোড এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সংযোগে আধুনিক সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পুলিশ, বিজিবি, র্যাবসহ বিভিন্ন বাহিনীর অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নিরাপত্তা সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজ চলছে।
বায়েজিদ লিংক সংলগ্ন খাস জমিতে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার স্থানান্তরের ঝুলে থাকা প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য জেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান। একই সঙ্গে বেতুয়া ও চা বাগান এলাকায়ও অপরাধী নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চলবে বলে ঘোষণা দেন তিনি।
শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলতে সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। কোনো সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ বা অপরাধী চক্রকে রাষ্ট্রের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে দেওয়া হবে না। জনগণকে সঙ্গে নিয়েই সরকার শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
মন্তব্য করুন
Design & Developed by: BD IT HOST