
পদ্মা সেতু উত্তর থানা প্রতিনিধি:
আগেই আশঙ্কা করা হয়েছিল- এবারের বর্ষায় লৌহজং ও টঙ্গীবাড়ি উপজেলার পদ্মা তীরবর্তী এলাকায় ভাঙন দেখা দিবে। চলমান বৈরী আবহাওয়ায় শনিবার সকাল থেকে বৃষ্টি, প্রচণ্ড বাতাস আরপ্রবল স্রোতের কারণে লৌহজং উপজেলার পদ্মাপাড়ের কয়েকটি এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে উপজেলার সিংহেরহাটি ও বড়নওপাড়া এলাকায় পদ্মার উত্তাল ঢেউয়ের আঘাতে ফেলে রাখা বালুভর্তি জিও ব্যাগ সরে যাচ্ছে। অনেক জায়গায় মাটি সরে গিয়ে ফাটল দেখা দিয়েছে। এদিন বিকালে প্রবল স্রোত ও উঁচু উঁচু ঢেউয়ের আঘাতে ভাঙনের মাত্রা বেড়েছে সকালের চেয়ে দ্বিগুণ। এতে পদ্মাপাড়ের মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এদিন বিকালে
সরেজমিনে দেখা যায়, সিংহেরহাটি গ্রামের দেলোয়ার দেওয়ান ভাইবোন নিয়ে পানিতে নেমে বাঁশ, কচুরিপানা, খড়কুটো দিয়ে নদীর ভাঙন থেকে বাড়িঘর রক্ষার চেষ্টা করছেন। তিনি জানান, কাল সকালে তার মৃত বাবা জয়নাল দেওয়ানের দাফন দিয়েছেন। শোকের মধ্যেই নদীভাঙন থেকে বাড়ি রক্ষায় নেমেছেন। বড়নওপাড়া গ্রামের পুতুল আক্তার জানান, শুক্রবার সকাল থেকেই পদ্মার ভাঙনে জিও ব্যাগ সরে যাচ্ছে। এর ফলে মাটি সরে গিয়ে অনেক জায়গায় ফাটল দেখা দিয়েছে। সিংহেরহাটি গ্রামের বাসিন্দা মোস্তফা কামাল বলেন, আমার বাড়িটি কনকসার-নাহেরহাট খালের উৎসমুখ পদ্মাপাড়ে। আমার বাড়ির পূর্বপাড় থেকে ব্লক ফেলে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু আমার বাড়ি থেকে পশ্চিমে প্রায় ৫০০ মিটার এলাকা স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের বাইরে রয়েছে। যেভাবে ভাঙন শুরু হয়েছে, তাতে (শনিবার) রাতটুকু থাকতে পারবো কিনা জানি না। ভাঙনের খবর পেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নেছার উদ্দিন ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করে স্থানীয়দের সাথে কথা বলেছেন। যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে ভাঙন প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পদ্মানদীর ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পেতে পদ্মা সেতুর ভাটিতে বাম তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে মাত্র ৪৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ। লৌহজং উপজেলার শিমুলিয়া থেকে টঙ্গীবাড়ি উপজেলার দীঘিরপাড় পর্যন্ত পদ্মা নদীর ১৩ দশমিক ৭২ শতাংশ কিলোমিটার তীর এলাকায় চলছে স্থায়ী ও সতর্কতামূলক বাঁধ নির্মাণের কাজ। এর মধ্যে স্থায়ী প্রতিরক্ষা কাজ ৯ দশমিক ১০০ কিলোমিটার এবং সতর্কতামূলক প্রতিরক্ষা কাজ (ভাঙনপ্রবণ এলাকায় বালুভর্তি জিও ব্যাগ রাখা স্থান) ৪ দশমিক ৬২০ কিলোমিটার। ২০২১ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া এ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৩ সালের অক্টোবরে। তখন ৯ দশমিক ১ কিলোমিটার এলাকায় বাঁধ নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। অর্থ বরাদ্দ ছিল ৪৪৬ কোটি টাকা। পরে বাঁধ নির্মাণের দৈর্ঘ্য বাড়িয়ে করা হয় ১৩ দশমিক ৭২ শতাংশ কিলোমিটার। আর ৪৪৬ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে অর্থ বরাদ্দ করা হয় ৪৭০ কোটি টাকা। সর্বশেষ গত বছরের ডিসেম্বরে পুনরায় বরাদ্দ বাড়িয়ে ৫২৭ কোটি টাকা করা হয়। সেই সাথে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে করা হয় ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর। বর্ষা মৌসুমের আগে বাঁধ নির্মাণের কাজ ধীর গতিতে শঙ্কিত পদ্মাপাড়ের বাসিন্দারা। আড়াই দশকে দুই উপজেলার প্রায় ৪০টি গ্রাম বিলীন হয়েছে। ভিটেমাটি, জমিজমা হারিয়েছেন অর্ধ লক্ষ পরিবার। গাওদিয়া গ্রামের কাজী বাবুল বলেন, পদ্মার ভাঙনে দুই দশক আগে বসতবাড়ি, জমাজমি হারিয়ে বর্তমানের স্থানে আছি। এখান থেকে নদী মাত্র ২০০ মিটার দূরে। বাঁধের কাজ দ্রুত শেষ হলে শান্তিতে ঘুমাতে পারতাম। মুন্সীগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি প্রায় ৪৮ শতাংশ। ২৬টি প্যাকেজের মাধ্যমে প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। উপসহকারী প্রকৌশলী এনামুল হক জানান, প্রকল্পের দৈর্ঘ্য ১৬ দশমিক ৮৭০ কিলোমিটার। এর মধ্যে প্রতিরক্ষা কাজ ৯ দশমিক ১০০ কিলোমিটার এবং সতর্কতামূলক প্রতিরক্ষা কাজ (ভাঙনপ্রবণ এলাকায় বালুভর্তি জিও ব্যাগ রাখা স্থান) ৪ দশমিক ৬২০ কিলোমিটার। এছাড়া ১ দশমিক ৩০০ কিলোমিটার এলাকায়
স্থায়ী বাঁধ বিদ্যমান রয়েছে। কিন্তু প্রকল্প বহির্ভূত এলাকা রয়েছে ১ দশমিক ৮৫০ কিলোমিটার। কনকসার খালের মুখে পদ্মাতীরের বাসিন্দা গোলাম মোস্তফা বলেন, আমার বাড়ি থেকে পশ্চিমে ৫০০ মিটার এলাকা স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের বাইরে, তাই শঙ্কায় আছি। গত বছর ঢেউয়ের আঘাতে অনেক ক্ষতি হয়েছে। আমাদের এখানে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ হলে নিশ্চিন্ত হতাম।
এ বিষয়ে উপসহকারী প্রকৌশলী এনামুল হক বলেন, স্থায়ী বাঁধে কিংবা সতর্কতামূলক স্থানে ভাঙন দেখা দিলে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মন্তব্য করুন
Design & Developed by: BD IT HOST