যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি সার্বভৌম স্বাধীন বাংলাদেশ, সেই বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যই নির্মিত ভবন আজ অবহেলা-অযত্নে পড়ে আছে। কোনো কাজেই আসছে না ধর্মপাশা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবনটি।
সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলায় অসচ্ছল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আর্থসামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে নির্মিত হয় এই কমপ্লেক্স। কিন্তু উদ্বোধনের ৬ বছর পেরিয়ে গেলেও সেখান থেকে কোনো সুফল পাচ্ছেন না স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা।
সরেজমিনে দেখা যায়, ভবনটির সামনে জমে আছে ময়লা-আবর্জনা। মূল ফটকের সামনে বালুর স্তূপ। লোহার গেটে ধরেছে মরিচা। সীমানা প্রাচীরের ভেতরেও পড়ে আছে উচ্ছিষ্ট বালু। অথচ এই রাস্তা দিয়েই প্রতিদিন চলাচল করেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও হাজারো সাধারণ মানুষ। তবুও কারও যেন কোনো মাথাব্যথা নেই।
ধর্মপাশা থানার কিছুটা পূর্বে কংস নদের পাড় ঘেঁষে ২ কোটি ১৭ লাখ ৫ হাজার ৭৭১ টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয় ভবনটি। ২০১৮ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি কাজ শুরু হয়ে ২০১৯ সালের মাঝামাঝি শেষ হয়। নির্মাণ কাজ করে বাছেদ ইঞ্জিনিয়ারিং ও মেসার্স আনোয়ারা এন্টারপ্রাইজ। ২০২০ সালের ২০ ডিসেম্বর ভবনটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।
ভবনের প্রথম ও দ্বিতীয় তলা বাণিজ্যিক ভিত্তিতে দোকান ও হলরুম ভাড়ার জন্য এবং তৃতীয় তলা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের অফিস ও সম্মেলন কক্ষ হিসেবে নির্ধারিত।
স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা জানান, ভবনের দুই তলায় ১৪টি দোকানঘর থাকলেও একটি দোকানও ভাড়া হয়নি। ফলে আয়ের উৎস থেকেই বঞ্চিত হচ্ছেন জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানরা।
এর প্রধান কারণ ভবনের অবস্থান। মূল সড়কের উল্টো দিকে এবং উত্তর পাশে সীমানা প্রাচীর ও পূর্ব দিকে মূল ফটক থাকায় ভবনটি প্রধান সড়ক থেকে আড়ালে পড়ে গেছে। যে কারণে ব্যবসায়ীরা আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। উপজেলা প্রশাসন বিভিন্ন সময় ভাড়ার বিজ্ঞপ্তি দিলেও কোনো সাড়া মেলেনি।
বীর মুক্তিযোদ্ধা কালা মিয়া ক্ষোভের সাথে বলেন,”নতুন ভবনে আমাদের আসা-যাওয়া নেই। কমিটি না থাকায় এমন অবস্থা। সাংগঠনিক কার্যক্রম না থাকায় ভবনটি মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো কাজেই আসছে না। যে উদ্দেশ্যে এটি করা হয়েছে, তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। এত স্পর্শকাতর একটি বিষয় এভাবে পড়ে আছে, এর কারণ আমি জানি না।”*
আরেক বীর মুক্তিযোদ্ধা নাজিমুদ্দিন বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের কেউ সেখানে যাতায়াত করেন না। অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধারা এখান থেকে কোনো সুযোগ-সুবিধাই পাচ্ছেন না। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থানের জন্য ভবনটি করা হলেও সড়কমুখী না হওয়ায় কোনো অংশই ভাড়া দেওয়া যাচ্ছে না। অবিলম্বে মূল ফটক ও প্রথম তলার কক্ষগুলোকে প্রধান সড়কমুখী করে পুনর্নির্মাণের দাবি জানাই। বর্তমান সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করছি।
ধর্মপাশা উপজেলা প্রকৌশলী শাহাব উদ্দিন বলেন, ভবনের প্রথম তলার কক্ষগুলোকে প্রধান সড়কমুখী করার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
ধর্মপাশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জনি রায় বলেন,”আয়বর্ধক কাজে ব্যবহারের জন্য প্রথম ও দ্বিতীয় তলার কক্ষগুলো ভাড়া দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এ বিষয়ে মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে অবগত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সন্তান সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল এর পক্ষ থেকে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
সংগঠনের নেতৃবৃন্দ বলেন, যাদের রক্তের বিনিময়ে এই দেশ স্বাধীন হয়েছে, তাদের জন্য নির্মিত ভবন আজ ধুলায় পড়ে আছে। এটা জাতির জন্য লজ্জার। আমরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিকট জোর দাবি জানাই, অতি দ্রুত অসচ্ছল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মূল্যায়ন নিশ্চিত করুন এবং মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবনের অসম্পূর্ণ কাজগুলো সম্পন্ন করে ভবনটিকে মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহার উপযোগী করা হোক। জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান দিতেই হবে।
মন্তব্য করুন
Design & Developed by: BD IT HOST