বর্তমান সমাজের অন্যতম উদ্বেগজনক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে কিশোর গ্যাং ও মাদকের বিস্তার। বয়সে কিশোর হলেও অনেকেই নানা অপরাধচক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। মাদকাসক্তি, ছিনতাই, মারামারি, চাঁদাবাজি ও নানা ধরনের অপরাধে কিশোরদের সম্পৃক্ততা শুধু ব্যক্তি বা পরিবারের জন্য অশনি সংকেত নয়—সমগ্র সমাজের জন্যই বড় হুমকি।
কিশোররা হঠাৎ করে অপরাধী হয়ে ওঠে না। পারিবারিক অবহেলা, সঠিক দিকনির্দেশনার অভাব, খারাপ সঙ্গ, সামাজিক অস্থিরতা, মাদকের সহজলভ্যতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহারসহ নানা কারণ তাদের বিপথে ঠেলে দিতে পারে। তাই শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে এ সমস্যা পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়।
প্রথম দায়িত্ব পরিবারের। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, কী করছে—এসব বিষয়ে বাবা-মাকে সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে। সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যাতে সে নিজের সমস্যা ও অভিজ্ঞতার কথা নির্ভয়ে পরিবারের কাছে বলতে পারে। শুধু শাসন নয়, ভালোবাসা, সময় ও মূল্যবোধের শিক্ষাও দিতে হবে।
অন্যদিকে প্রশাসনকে মাদকের সরবরাহ বন্ধে কঠোর ও নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে। মাদক ব্যবসায়ী ও অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি কিশোরদের ক্ষেত্রে সংশোধন ও পুনর্বাসনের সুযোগও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ একজন বিপথগামী কিশোরকে শুধুই অপরাধী হিসেবে দেখলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না; তাকে সমাজের ইতিবাচক ধারায় ফিরিয়ে আনাও জরুরি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা এখানেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক, অভিভাবক, স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে নিয়মিত সমন্বয় থাকা দরকার। পাড়া-মহল্লায় খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বিতর্ক, পাঠচক্র ও সৃজনশীল কার্যক্রম বাড়াতে হবে। তরুণদের সময় ও প্রতিভাকে ইতিবাচক কাজে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণের সহযোগিতাও অপরিহার্য। কোনো এলাকায় মাদক বিক্রি বা কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা দেখা দিলে বিষয়টি গোপন না রেখে দায়িত্বশীলভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাতে হবে। তবে একই সঙ্গে কিশোরদের সামাজিকভাবে অপমান বা হেয় না করে তাদের সংশোধনের সুযোগ দিতে হবে।
মনে রাখতে হবে, কিশোর গ্যাং দমন শুধু পুলিশের দায়িত্ব নয়, আবার সন্তানকে দেখাশোনা করাই শুধু পরিবারের দায়িত্ব নয়। এটি একটি সম্মিলিত সামাজিক দায়িত্ব। প্রশাসন, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি এবং সাধারণ মানুষ—সবাইকে একই লক্ষ্যে কাজ করতে হবে।
আজকের কিশোররাই আগামী দিনের নাগরিক ও নেতৃত্ব। তাদের হাতে মাদক নয়, বই তুলে দিতে হবে; অপরাধ নয়, খেলাধুলা ও সৃজনশীলতার সুযোগ দিতে হবে। কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে পারলেই কিশোর গ্যাং ও মাদকমুক্ত একটি নিরাপদ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
আসুন সচেতন হই, সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠিত করি।
মন্তব্য করুন
Design & Developed by: BD IT HOST