মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার গ্রামীণ জনপদে অবস্থিত বহলবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রত্যন্ত এলাকার এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বহলবাড়িয়া, খালিয়া, বালিয়াডাঙ্গা ও চরপুখরিয়া এলাকার শিশুদের শিক্ষার আলো ছড়িয়ে আসছে।
১৯৯১ সালে স্থানীয় শিক্ষানুরাগীদের উদ্যোগে নিবন্ধিত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হিসেবে বিদ্যালয়টির যাত্রা শুরু হয়। প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক মো. আবুল খায়ের মিয়া এবং তৎকালীন পরিচালনা কমিটির সভাপতি আকতার হোসেন মাস্টারের উদ্যোগে গড়ে ওঠে প্রতিষ্ঠানটি। প্রত্যন্ত এলাকার শিশুদের কাছে শিক্ষার সুযোগ পৌঁছে দেওয়াই ছিল বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০০৬ সালে বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১৭৬ জন। এর মধ্যে ৮৭ জন ছিল ছাত্রী। বর্তমানে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী রয়েছে ৭৪ জন, যার প্রায় অর্ধেকই ছাত্রী।
বর্তমানে প্রধান শিক্ষক সখিনা আক্তারের নেতৃত্বে তিনজন সহকারী শিক্ষক পাঠদান করছেন। মাত্র তিনটি পুরোনো শ্রেণিকক্ষে চলছে শিক্ষা কার্যক্রম। জায়গা ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে প্রাক-প্রাথমিক কার্যক্রম পরিচালনাতেও রয়েছে নানা সমস্যা।
তবে নানা সংকটের মধ্যেও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে রয়েছে আগ্রহ। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে শিশুরা বিদ্যালয়ে এসে পাঠ গ্রহণ করছে।
বিশেষ করে চরপুখরিয়া ও আশপাশের এলাকার শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আসতে খাল ও দুর্গম গ্রামীণ পথ পাড়ি দিতে হয়। বিদ্যালয়ে কার্যকর নলকূপসহ কিছু মৌলিক সুবিধার ঘাটতিও রয়েছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের পড়াশোনার জন্য খাতা-কলম, পোশাকসহ বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণ কিনতে অভিভাবকদের নিয়মিত অর্থ ব্যয় করতে হয়। পরিবারের সামর্থ্য ও শিশুর প্রয়োজন অনুযায়ী এসব খাতে মাসে প্রায় ৪৫ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে। স্বল্প আয়ের পরিবারের জন্য এ ব্যয়ও অনেক সময় বড় চাপ হয়ে দাঁড়ায়।
তারপরও সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে অভিভাবকেরা এসব ব্যয় বহন করছেন। তাদের প্রত্যাশা, সন্তানরা শিক্ষিত হয়ে নিজেদের ও পরিবারের ভাগ্য পরিবর্তনের পাশাপাশি এলাকার উন্নয়নেও ভূমিকা রাখবে।
শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে শুধু শিক্ষার্থী ভর্তি ও উপস্থিতি নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়। শিশুরা বিদ্যালয়ে এসে প্রকৃতপক্ষে কতটা শিখছে, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রাথমিক পর্যায়েই পড়া, লেখা ও গণনার মৌলিক দক্ষতা নিশ্চিত করা না গেলে পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি আরও বাড়তে পারে।
এ কারণে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত মূল্যায়নের মাধ্যমে দুর্বলতা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া, শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণ এবং অভিভাবকদের সঙ্গে বিদ্যালয়ের কার্যকর যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয়দের মতে, বিদ্যালয়ের উন্নয়নে শুধু সরকারি উদ্যোগের ওপর নির্ভর না করে স্থানীয় জনগণ, সাবেক শিক্ষার্থী, অভিভাবক, পেশাজীবী ও এলাকার শুভাকাঙ্ক্ষীদেরও এগিয়ে আসা উচিত। বই ও শিক্ষা উপকরণ প্রদান, শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দেওয়া, ঝরে পড়া রোধ এবং বিদ্যালয়ের মৌলিক সুবিধা উন্নয়নে স্থানীয়ভাবে উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, বিদ্যালয়টির অবকাঠামোগত সমস্যা ও মৌলিক সুবিধার ঘাটতি দূর করে শিক্ষার পরিবেশ আরও উন্নত করা হবে। পাশাপাশি বিদ্যালয়ের সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে।
ছোট একটি বিদ্যালয় হলেও বহলবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ঘিরে রয়েছে একটি পুরো এলাকার ভবিষ্যৎ। তাই বিদ্যালয়টির উন্নয়নকে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন হিসেবে নয়, বরং আগামী প্রজন্মের জন্য বিনিয়োগ হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
মন্তব্য করুন
Design & Developed by: BD IT HOST