টানা দুই দিনের ভারী বর্ষণে নড়াইল জেলার তিনটি পৌরসভা নড়াইল, লোহাগড়া ও কালিয়া বিস্তীর্ণ এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। ঘরবাড়ি, সড়ক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সরকারি দপ্তরে পানি ঢুকে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। শত শত পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছে। কোথাও রান্না বন্ধ, কোথাও বিশুদ্ধ পানির সংকট, আবার কোথাও আসবাবপত্র পানিতে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল-জলাশয় ভরাট, দখল এবং দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। নড়াইল পৌরসভার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, দুর্গাপুর, আলাদাতপুর, মহিষখোলা, ভাদুলীডাঙ্গা, কুড়িগ্রাম, ভয়াখালী, বাহিরডাঙ্গা ও বরুণসহ বিভিন্ন এলাকায় সড়ক, সরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং শতাধিক ঘরবাড়িতে পানি জমে আছে। অনেক পরিবারের ঘরের ভেতরে হাঁটুপানি জমেছে। রান্নাঘরে পানি ওঠায় রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক টিউবওয়েল পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির সংকটও দেখা দিয়েছে। জানা যায়, ১৯৭২ সালে ২৮ দশমিক ৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে নড়াইল পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ১৯৯৯ সালে এটি দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে প্রথম শ্রেণির পৌরসভায় উন্নীত হয়। তবে দীর্ঘ সময় পার হলেও প্রয়োজন অনুযায়ী ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন হয়নি। শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত চিত্রা নদী, রূপগঞ্জ-তুলারামপুর খাল, ভাদুলীডাঙ্গা-মুলিয়া খাল এবং উত্তর ভওয়াখালী-বাঁশভিটা-মুলিয়া খালসহ কয়েকটি জলাশয় একসময় প্রাকৃতিকভাবে পানি নিষ্কাশনের কাজ করলেও বর্তমানে এসব খাল ও জলাশয়ের অনেক অংশ ভরাট ও দখল হয়ে গেছে। এছাড়া অপরিকল্পিতভাবে সড়ক নির্মাণ এবং পানি চলাচলের পথ সংকুচিত হওয়ায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নামতে পারছে না। ভাদুলীডাঙ্গা এলাকার বাসিন্দা সুকান্ত বিশ্বাস বলেন, ‘পর্যাপ্ত নালা নেই, যেগুলো আছে সেগুলোও অনেকগুলো অচল। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই পুরো এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়।দুর্গাপুর এলাকার আলামিন জানান, ‘বাড়ির ভেতরে পানি ঢুকে আসবাবপত্র নষ্ট হচ্ছে। রান্নাঘরে পানি থাকায় রান্না করতে পারছি না।কুড়িগ্রাম এলাকার বাসিন্দা এস. এম. হালিম মন্টু বলেন, ‘একসময় শহরের চারদিকে খাল ও জলাশয় ছিল। সেগুলো দখল ও ভরাট হওয়ায় এখন পানি বের হওয়ার পথ নেই।নড়াইল প্রেসক্লাবের সেক্রেটারি বলেন, ‘আমার বাসার কাঁথা-বালিশ, আলমারিসহ প্রায় সব আসবাবপত্র ভিজে গেছে। বিদ্যুৎ না থাকায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রতিবছর একই দুর্ভোগ পোহাতে হয়।নড়াইল পৌর প্রশাসক নাজমুল হুদা বলেন, প্রতিবছরই জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করা হয়। এবারও বিভিন্ন স্থানে পানি অপসারণে কর্মীরা কাজ করছেন।
লোহাগড়া পৌরসভাতেও একই চিত্র
দুই দিনের টানা বর্ষণে লোহাগড়া পৌর শহরের লক্ষ্মীপাশা, রাজুপুর, খলিশাখালী, গোপীনাথপুর, জয়পুর, ব্যাপাড়ীপাড়া, মদিনাপাড়া, কলেজপাড়া, সরকারপাড়া, আলা মুন্সির মোড়, সরদারপাড়া, পোদ্দারপাড়া, মোচড়া ও গন্ধবাড়িয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় তীব্র জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। সড়ক ডুবে যাওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। নিচু এলাকার অসংখ্য বাড়িতে পানি ঢুকে পড়েছে। মোচড়া গ্রামের মোঃ সাইমুন ইসলাম জানান অনেক পরিবার সারাদিন ঘরের পানি সেচে বাইরে ফেলতে ব্যস্ত রয়েছে। রান্নাঘর পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় অনেক পরিবার খাবার রান্না করতে পারছে না। স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল-জলাশয় ভরাট এবং অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে প্রতিবছর একই দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়। তারা দ্রুত কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণ এবং পানি নিষ্কাশনের স্থায়ী উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। লোহাগড়া পৌর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে পানি অপসারণের কাজ চলছে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
কালিয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায় কলেজ রোড
অন্যদিকে, কালিয়া পৌরসভার ব্যস্ততম কলেজ রোডে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। মুন্সি বেকারির চৌরাস্তা থেকে জামায়াতে ইসলামী কার্যালয় পর্যন্ত সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় পথচারী, শিক্ষার্থী ও যানবাহন চলাচলে চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সড়কটির ড্রেনেজ ব্যবস্থা অকার্যকর থাকায় অল্প বৃষ্টিতেই পানি জমে যায়। দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা এবং স্থায়ী ড্রেন নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন তারা। সচেতন মহলের দাবি, প্রতিবছর একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি হলেও স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। খাল ও জলাশয় পুনরুদ্ধার, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণ এবং পরিকল্পিত নগরায়ণের মাধ্যমে নড়াইলের তিন পৌর এলাকার দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
মন্তব্য করুন
Design & Developed by: BD IT HOST