চিত্রা, নবগঙ্গা, কাজলা, মধুমতী নদী বিধৌত নড়াইল কৃষি ভিত্তিক জেলা। ধান আর পাটই এ জেলার প্রধান ফসল। সোনালী আঁশ খাত পাট চাষের জন্য এ জেলার পরিচিতি এবং সুনাম কম নয়। এ বছর জেলায় পাটের বাম্পার হয়েছে। বর্তমানে এই জেলার কৃষক পাট শুকিয়ে সোনালী আঁশ ঘরে তুলছেন, বিক্রিও করছেন ভালো দামে। সেই সঙ্গে পাটকাঠি রোদে শুকিয়ে বাড়ির আঙিনায় পালা দিয়ে রাখছেন চড়া দামে বিক্রির আশায়। তাই যে দিকে দু’চোখ যায়, রুপালী কাঠি রক্ষণাবেক্ষণের কাজে ব্যস্ত কৃষককুল। এক সময় পাটকাঠি কৃষকদের বোঝা মনে হলেও এখন তা ফেলনা নয়, হয়ে উঠেছে আয়ের উৎস, জীবিকার অন্যতম অবলম্বন। পাটের পাশাপাশি জ্বালানি, ঘরের বেড়া, পানের বরজে এবং বাড়িঘরের ছাউনি বা বেড়া তৈরির কাজে পাটকাঠির ব্যাপক চাহিদা বেড়েছে। এখন কৃষক স্বপ্ন দেখেন, সোনালী আঁশের সঙ্গে রূপালী কাঠি বিক্রি করে লাভবান হওয়ার। এ জন্য কৃষকরা যত্নসহকারে পাটকাঠির রক্ষণাবেক্ষণ করছেন। সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, কৃষকরা জমি থেকে পাট কাটতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। অনেক জমির পাট কেটে ফেলা হয়েছে। পাট পানিতে জাগ দিয়ে আঁশ ছাড়িয়ে নিয়ে বিক্রি করে ফেলেছে। এখন চলছে পাটকাঠি শুকানোর কাজ। গ্রামীণ সড়কের দুই পাশ ও বাড়ির উঠানে পাটকাঠি সারি সারি রেখে দিয়েছেন। পাটকাঠি শুকানো শেষ হলে আঁটি বেঁধে বাড়ির আঙিনায় স্তূপ করে রাখছেন। এসব পাটকাঠি পানের বরজ, ক্ষেতের চারপাশে বেড়া দেয়া, গরুর ঘর, রান্না ঘরে বেড়া দেয়া ও জ্বালানিসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে এক সময় জেলার ৯০ ভাগ কৃষক মনে করতেন পাটকাঠি শুধু জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার ছাড়া কিছুই করা যায় না। এ কারণে যেখানে সেখানে ফেলে রাখা হতো। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ব বাজারে পাটকাঠির চাহিদা বাড়ায়, পাটের পাশাপাশি পাটকাঠির দামও ভালো পাওয়া যায়। তাই অনেক কৃষক পাটের সঠিক মূল্য না পেলেও পাটকাঠি বিক্রি করে পুষিয়ে নিচ্ছেন। প্রতি আঁটি পাটকাঠি ২০ টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে। লোহাগড়া উপজেলার মোচড়া গ্রামের পাট চাষী মোঃ সাহিদুল ইসলাম বলেন, কয়েক বছর আগে পাটকাঠি বাড়ির আঙিনায় পচে নষ্ট হতো। বর্তমানে পাটকাঠির ব্যাপক চাহিদা, তাই ভালো দাম পাওয়ায় খুশি আমরা । উপজেলার জয়পুর গ্রামের কৃষক শওকত বলেন, ‘ফেলনা পাটকাঠির আগে কদর ছিল না, তাই ফেলে দিতাম। এখন এটা সোনার হরিণ। যত সময় নিয়ে বিক্রি করা যাবে তত লাভবান হওয়া যায়।’ লোহাগড়া শহরের পোদ্দারপাড়া এলাকার অবসরপ্রাপ্ত কৃষি কর্মকর্তা রঘুনাথ কর বলেন, এখন আর পাটকাঠি ফেলনা নয়। পাটের পাশাপাশি উচ্চমূল্যে পাটকাঠি বিক্রি হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, মুকসুদপুর উপজেলার বাতাকামারী ইউনিয়নের চারকোলা মিল স্থাপন হয়েছে। এখানে পাটকাঠি পুড়িয়ে ছাই বের করা হয়। সেই ছাই থেকে কার্বন পেপার, কম্পিউটারের প্রিন্টারের কালি, ফটোকপির কালি, আতশবাজি, মোবাইল ব্যাটারি, প্রসাধনী পণ্য, বিষ ধ্বংসকারী ওষুধ, দাঁত পরিষ্কারের মাজান, সার উৎপাদনের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে ছাই থেকে বের হওয়া কার্বন বিদেশে রপ্তানি করা হচ্ছে। তাই দেশ ও বিদেশে পাটকাঠির কদর বেড়েছে। নড়াইল জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে নড়াইল জেলায় ২৩ হাজার হেক্টর জমিতে পাট আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে নড়াইল সদর উপজেলায় ৬ হাজার ৯৪২ হেক্টর, লোহাগড়া ১২ হাজার ১৬৫ হেক্টর এবং কালিয়া উপজেলায় ৪ হাজার ৪১০ হেক্টর জমিতে পাটের চাষাবাদ করা হয়েছে। এ বছর জেলায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অধিক পরিমাণ জমিতে পাট চাষাবাদ হয়েছে। এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় পাটের ফলন ভালো হয়েছে। সেখান থেকে বিপুল পরিমাণ পাটকাঠি পাওয়া যাবে। আর তা বিক্রি করে কৃষকরা দামও ভালো পাবেন। লোহাগড়া উপজেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক দেবদুলাল KzÛz বলেন, ‘পাট উৎপাদনে দেশের মধ্যে নড়াইল জেলার সুনাম ও ঐতিহ্য রয়েছে। এবার পাটের পাশাপাশি পাটকাঠি বিক্রি করে কৃষকরা লাভবান হবেন বলে আশা করা যাচ্ছে।
মন্তব্য করুন
Design & Developed by: BD IT HOST