মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার মেদিনীমণ্ডল ইউনিয়ন যশলদিয়া ও কুমারভোগ পদ্মাসেতু প্রাথমিক বিদ্যালয় নামে দুটি স্কুলে শিক্ষকেরা প্রায় দুই বছর ধরে বেতন-ভাতা ও বোনাস ছাড়াই দায়িত্ব পালন করছেন। একই সঙ্গে বিদ্যালয় দুটিতে নিরাপদ পানীর অভাব, নষ্ট ফ্যান, বেঞ্চ এবং অন্যান্য শিক্ষা উপকরণের সংকটে ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান।
দীর্ঘদিন ধরে সরকারি কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাবে শিক্ষার্থীরাও ভোগান্তিতে পড়ছে।
পদ্মাসেতু নির্মাণে যাদের বাড়িঘর অধিগ্রহণ করা হয়েছিল, তাদের পুনর্বাসনের জন্য সরকার লৌহজংয়ের যশলদিয়া ও কুমারভোগ এবং শরীয়তপুরের জাজিরায় দুটি পুনর্বাসন কেন্দ্র নির্মাণ করে। এসব পুনর্বাসন কেন্দ্রে অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি চারটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠা করা হয়। ২০১৭ সালের মে মাসে বিদ্যালয়গুলো চালু হওয়ার পর থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত শিক্ষকেরা নিয়মিত বেতন-ভাতা, বোনাসসহ অন্যান্য সুবিধা পেয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১৭ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বিদ্যালয়গুলো পরিচালনা করে রিসোর্স ইন্টিগ্রেশন সেন্টার (রিক)। পরে ২০২০ সাল থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত পরিচালনার দায়িত্বে ছিল সমাহার এনজিও। ২০২৪ সালের জুনে বিদ্যালয়গুলো সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। একই বছরের জুলাই মাসে সরকারি গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে বিদ্যালয় চারটিকে সরকারি আওতায় নেওয়া হলেও দুই বছরেও কার্যক্রম শুরু হয়নি। ফলে ২০২৪ সালের জুনের পর থেকেই শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বন্ধ রয়েছে এবং বিদ্যালয়গুলো বিভিন্ন সংকটের মুখে পড়েছে।
যশলদিয়া পদ্মাসেতু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা লাকী আক্তার বলেন, “আমাদের বিদ্যালয়ে বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সহ ৫ জন শিক্ষক এবং ১৮০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। এর আগে সর্বোচ্চ ২৮০ জন শিক্ষার্থী ছিল। দুই বছর ধরে আমরা বেতন-ভাতা ও বোনাস ছাড়াই পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছি। অধিকাংশ শিক্ষক স্থানীয় নন। তাই বাড়ি ভাড়া করে থাকতে হয়। উপবৃত্তি না পাওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী অন্য বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে যাচ্ছে। বিদ্যালয়ের ফ্যান নষ্ট থাকায় প্রচণ্ড গরমে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান কঠিন হয়ে পড়েছে। বেঞ্চের অভাবে অনেক শিক্ষার্থী ঠিকমতো বসতে পারে না। নিরাপদ পানীয় জলের ব্যবস্থাও নেই। সরকারি কোনো বরাদ্দ না থাকায় বাধ্য হয়ে শিশুদের কাছ থেকে খুচরা টাকা নিয়ে চক, ডাস্টারসহ প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ কিনতে হচ্ছে।”
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিদ্যালয়ের এক সহকারী শিক্ষক বলেন, “আমাদের বিদ্যালয়ে সাতজন শিক্ষক ও চারজন কর্মচারী ছিলেন। সরকারি কাঠামো অনুযায়ী একজন প্রধান শিক্ষক ও চারজন সহকারী শিক্ষকসহ মোট পাঁচজন থাকার কথা। তাই অন্যান্য শিক্ষকেরা চলে গেছেন। বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকসহ পাঁচজন দায়িত্ব পালন করছি। প্রধান শিক্ষক যোগদান করলে আরও একজনের চাকরি চলে যাবে। দীর্ঘদিন এখানে চাকরি করায় অনেকের সরকারি চাকরিতে আবেদনের বয়সও শেষ হয়ে গেছে। এই স্কুলে ভবিষ্য নিয়ে সবাই উদ্বিগ্ন। তবে কতৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে কোন লাভ হচ্ছে না এমন অভিযোগ রয়েছে।
কুমারভোগ পদ্মাসেতু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শান্তা আক্তার বলেন, “আমাদের বিদ্যালয়ে বর্তমানে ১৭০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে এবং প্রধান শিক্ষকসহ আমরা পাঁচজন দায়িত্ব পালন করছি। এর আগে ৭ জন শিক্ষক ছিলাম এবং ২৭০ এর অধিক শিক্ষার্থী ছিলো। আমাদের এখানে নানা সমস্যার মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো নিরাপদ পানীয় জলের অভাব, নষ্ট ফ্যান, বেঞ্চের সংকট এবং ওয়াশরুমের সমস্যা। এসব কারণে শিক্ষার্থীরা কষ্ট পাচ্ছে। সরকারি প্রক্রিয়া শেষ না হলেও উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে অন্তত নিরাপদ পানী, ফ্যান, বেঞ্চ, চক ও ডাস্টারের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষকদের বেতন চালুর উদ্যোগ নেওয়া উচিত।”
এ বিষয়ে লৌহজং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, লৌহজং যশলদিয়া ও কুমারভোগ পদ্মাসেতু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিষয়টি আমাদের জানা আছে। তবে বিদ্যালয়গুলো এখনো সরকারি কার্যক্রমের আওতায় আসেনি। সরকারি আওতায় না এলে আমাদের পক্ষে কোনো ধরনের বরাদ্দ বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব নয়। তবে কতৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে দেখি কিছু করা সম্ভব কি না।
স্থানীয়দের দাবি, পদ্মাসেতু প্রকল্পের আওতায় পুনর্বাসিত পরিবারের সন্তানদের শিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়গুলোকে দ্রুত পূর্ণাঙ্গ সরকারি ব্যবস্থাপনায় এনে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষা উপকরণ, নিরাপদ পানীয় জল এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সংকট নিরসনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। তানা হলে স্কুলে পাঠদান শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ও আঁধারে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মন্তব্য করুন
Design & Developed by: BD IT HOST