পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলার শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম দুই ভিত্তি—কাউখালী কেজি ইউনিয়ন সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় এবং কাউখালী এসবি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় তীব্র শিক্ষক সংকটে জর্জরিত। সরকারি ঘোষণার প্রায় চার দশক পার হতে চললেও প্রতিষ্ঠান দুটি কখনোই পূর্ণাঙ্গ শিক্ষক কাঠামো পায়নি। বর্তমানে ইতিহাসের সবচেয়ে তীব্র শিক্ষক-কর্মচারী সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রতিষ্ঠান দুটি, যার ফলে সাধারণ পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন চরম বিপন্ন হয়ে পড়েছে।
পরিসংখ্যানের আলোকেই সংকট কতটা প্রকট:
মোট শূন্যপদ: প্রতিষ্ঠান দুটিতে মোট ৩৪টি শিক্ষক পদের মধ্যে বর্তমানে ২২টি পদই খালি।
শিক্ষক স্বল্পতা: প্রায় ৯০০ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ১১ জন শিক্ষক।
কর্মচারী সংকট: কর্মচারীদের ১০টি পদের বিপরীতে অধিকাংশ পদই দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পড়ে আছে। এই বেহাল দশার কারণে অসচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা ছেড়ে ঝরে পড়ছে, আর তুলনামূলক সচ্ছল পরিবারগুলো বাধ্য হয়ে সন্তানদের শহরমুখী করছে।
কাউখালী এসবি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে বর্তমানে ৪৫৬ জন ছাত্রী পড়াশোনা করছে। কিন্তু ১৭টি অনুমোদিত শিক্ষক পদের মধ্যে প্রধান শিক্ষকসহ ১১টি পদই দীর্ঘদিন ধরে খালি রয়েছে। এছাড়া কর্মচারীদের ৪টি পদের সবকটিই শূন্য। বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আকতার হোসেন হাওলাদার জানান, শিক্ষক সংকটের কারণে বর্তমানে মাত্র দুজন অতিথি শিক্ষক দিয়ে জোড়াতালি দিয়ে কোনোমতে পাঠদান চালু রাখা হয়েছে।
কাউখালী কেজি ইউনিয়ন সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে ৩৩৫ জন ছাত্রের এই বিদ্যাপীঠে ১৭ জন শিক্ষকের পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৪ জন শিক্ষক। দীর্ঘদিন ধরে কোনো স্থায়ী প্রধান শিক্ষক না থাকায় বিদ্যালয়ের দাপ্তরিক কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক না থাকায় নিয়মিত ক্লাস নেওয়াও অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বিজন হালদার জানান, শিক্ষক সংকটের কারণে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মান রক্ষা নিয়ে অভিভাবক সমাজে চরম ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। অভিভাবক এনামুল হক উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “সারাদেশের সরকারি স্কুলগুলোতে কম-বেশি শিক্ষক সংকট থাকলেও কাউখালীর এই দুটি স্কুলের সংকট সবচেয়ে ভয়াবহ। এভাবে চলতে থাকলে কাউখালীর পুরো শিক্ষাব্যবস্থাই শূন্যতায় ভেসে যাবে।”
আরেক অভিভাবক সানজিদা রেশমা ক্ষোভের সুরে জানান, “শিক্ষকদের খালি পদগুলো অতি দ্রুত পূরণ করা না হলে আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যতের দায়িত্ব কে নেবে?”
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য- উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আব্দুল হান্নান শিক্ষক সংকটের সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, “শিক্ষক সংকটের কারণে পাঠদান দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে অবহিত করা হয়েছে।”
বরিশাল মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর হোসাইন সংকট স্বীকার করে আশ্বাস দিয়েছেন যে, দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই শিক্ষক সংকট দূর করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তবে স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, কেবল আশ্বাসের বাণী নয়; অবিলম্বে শূন্য পদগুলোতে স্থায়ী শিক্ষক পদায়ন করে কাউখালীর ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দুটিকে রক্ষা করা হোক।
মন্তব্য করুন
Design & Developed by: BD IT HOST