মাহমুদুর রহমান মনজু লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি
৩ এপ্রিল ২০২৬, ২:৫৮ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

করাতের সুর থেমে গেছে: লক্ষ্মীপুরে হারিয়ে যাচ্ছে এক ঐতিহ্যবাহী পেশা

 

 

একসময় গ্রামবাংলার অতি পরিচিত দৃশ্য ছিল করাতিদের গাছ কাটার কাজ। করাত টানার ছন্দ, গানের সুর আর কর্মব্যস্ততার সেই মুহূর্ত এখন আর চোখে পড়ে না। কালের বিবর্তন ও জীবিকার তাগিদে পেশা পরিবর্তনের ফলে ঐতিহ্যবাহী করাতি সম্প্রদায় আজ বিলুপ্তির পথে।
লক্ষ্মীপুর জেলার বিভিন্ন গ্রামে একসময় করাতি সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস ছিল। শুষ্ক মৌসুম এলেই তারা দল বেঁধে বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে বড় বড় গাছ কেটে কাঠ তৈরি করতেন। গ্রামের পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে গাছ কাটার কাজ নেওয়াই ছিল তাদের প্রধান জীবিকা। কাঁধে করাত, হাতে কুড়াল, দা ও মোটা দড়ি নিয়ে তারা হাকডাক দিয়ে বলতেন—“গাছ চিরাবেন গাছ!” তখন গৃহস্থরা গাছ কাটার জন্য তাদের অপেক্ষায় থাকতেন।
আধুনিক প্রযুক্তির প্রভাবে এখন যান্ত্রিক ‘স’ মিল গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছে। ফলে করাতি পেশার চাহিদা কমে গেছে। বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে অনেকেই এখন অন্য লাভজনক পেশায় যুক্ত হয়েছেন। তবে দেশের কিছু এলাকায় এখনো জীবিকার তাগিদে এই পেশা ধরে রেখেছেন কয়েকজন।
নব্বই দশকের আগেও করাতিদের কাজ দেখতে পাড়ার মানুষ ভিড় জমাত। গানের তালে তালে করাত টানার দৃশ্য ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয়। করাতিরা সাধারণত সকালে গুড়-পান্তা বা লাল আটার রুটি খেয়ে কাজে নেমে পড়তেন। একটি দলে তিনজন গাছ কাটার কাজে নিয়োজিত থাকতেন, আর একজন রান্নার দায়িত্ব পালন করতেন। এভাবেই পুরো মৌসুম কাজ করতেন তারা।
তৎকালীন সময়ে করাতিরা মাটিতে গর্ত করে বা কাঠের কাঠামো তৈরি করে করাত চালাতেন। এই পদ্ধতিতে গাছ কাটতে উপরে ও নিচে দুই থেকে ছয়জন লোকের প্রয়োজন হতো। বড় করাত দিয়ে গাছ চিরে বিভিন্ন সাইজের কাঠ তৈরি করা হতো, যা দিয়ে ঘরের খুঁটি, তক্তা, আদল ও রুয়া বানানো হতো। কাঠের আকার ও পরিমাণ অনুযায়ী মজুরি নির্ধারণ করা হতো।
সরেজমিনে সদর উপজেলার পার্বতীনগর ইউনিয়ন ও রশিদপুর গ্রামের প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ৩৫ থেকে ৪০ বছর আগে ঘর নির্মাণের জন্য বড় গাছ কেটে করাতিদের দিয়ে কাঠ প্রস্তুত করা হতো। তখন বিভিন্ন গ্রামে একাধিক করাতি দল কাজ করত এবং তারা এলাকায় বেশ পরিচিত ছিলেন।
পার্বতীনগর ইউনিয়নের সৈয়দ আহমেদসহ অন্যান্য এলাকার করাতিরা দলবদ্ধভাবে গ্রামে গ্রামে কাজের সন্ধানে যেতেন। অনেক গৃহস্থ তাদের বাড়িতে গিয়ে প্রয়োজনীয় কাঠের মাপ নির্ধারণ করে কাজ দিতেন।
বশিকপুর ইউনিয়নের পাটোয়ারী বাজারের নুর আলম জানান, তিনি দীর্ঘদিন এ পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আগে কাজের অভাব ছিল না, কিন্তু এখন আধুনিক যন্ত্রের কারণে কাজ কমে গেছে।
সদর উপজেলা উত্তর হামছাদী ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক ভূঁইয়া বলেন, “আমার কৈশোরে ঘর নির্মাণের জন্য করাতিরা গাছ কেটে তক্তা ও খুঁটি তৈরি করত। গানের সুরে করাত চালানোর সেই দৃশ্য এখন আর দেখা যায় না।”
রায়পুর উপজেলার সাংবাদিক জহিরুল ইসলাম টিটু বলেন, “ছোটবেলায় গ্রামের পথে হাঁটতে গিয়ে গাছ চিরানোর দৃশ্য দেখে আনন্দ পেতাম। এখন সেই দৃশ্য একেবারেই হারিয়ে গেছে।”
রামগঞ্জ উপজেলার আরিফ হোসেন জানান, আগে প্রায় প্রতিটি গ্রামেই করাতিরা কাজ করত। কিন্তু এখন মানুষ শহরমুখী হওয়ায় এবং পাকা বাড়ির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এই পেশার চাহিদা কমে গেছে।
কমলনগর উপজেলার আব্দুর রহমান বলেন, “বর্তমানে মানুষ ‘স’ মিলে গিয়ে প্রয়োজনীয় কাঠ তৈরি করে নেয়। তাই করাতিদের প্রয়োজন আগের মতো নেই।”
রামগতি উপজেলার মোখলেসুর রহমান বলেন, “যন্ত্রচালিত করাতের মাধ্যমে স্বল্প সময়ে কাজ শেষ করা যায়। তাই ঐতিহ্যবাহী করাতি পেশা টিকে থাকতে পারছে না।”
সদর উপজেলার করাতি আব্বাস মিস্ত্রি জানান, “আগে বাপ-দাদার সঙ্গে এই কাজ করতাম। এখন করাতকল স্থাপনের কারণে সেই পেশা ছেড়ে দিয়েছি। বর্তমানে একটি করাত মিলে কাজ করছি।”
একসময় গ্রামীণ অর্থনীতি ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল করাতি পেশা। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির প্রভাবে সেই ঐতিহ্য আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। এখন আর শোনা যায় না করাতের ছন্দময় শব্দ—যান্ত্রিক শব্দই যেন জানিয়ে দিচ্ছে সময়ের পরিবর্তনের গল্প।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নেছারাবাদে “স্বাধীনতা কাপ শিশু কিশোর ফুটবল টুর্নামেন্ট-২০২৬ ফাইনাল খেলা অনুষ্ঠিত

মসৃণ ব্লক সড়কে গতি ফিরেছে গ্রামে, লক্ষ্মীপুরে কমেছে জনদুর্ভোগ

শ্রীনগরে বাংলা নববর্ষেরএকদিন পর হালখাতা অনুষ্ঠিত

পাথারিয়ায় ব্যবসায়ীকে নিয়ে বিভ্রান্তি, দুই পক্ষের ভিন্ন দাবি

সংঘর্ষের ভিডিও করায় দুই সাংবাদিককে রড দিয়ে পেটালো কবি নজরুল কলেজ ছাত্রদল

ডিএসসিসির উদ্যোগে ফুলে ভরে উঠলো ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনের ফুটপাত; দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণে সকলের সহযোগিতা চাইলেন প্রশাসক

বাইউস্টে বাংলা নববর্ষ, নবীন বরণ অনুষ্ঠান এবং ১১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্‌যাপন

গোয়ালন্দে ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণের উদ্বোধন: সরাসরি ১০ ধরনের সেবা পাবেন কৃষকরা

গোয়ালন্দে ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণের উদ্বোধন: সরাসরি ১০ ধরনের সেবা পাবেন কৃষকরা

শ্রীনগরে উৎসব মুখর পরিবেশে বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উদযাপন

১০

মতলব উত্তরে বাংলা নববর্ষে শোভা যাত্রা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান 

১১

ঢাকা জেলা গোয়েন্দা (ডিবি উত্তর) পুলিশের বিশেষ অভিযানে এক অস্ত্রধারী শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রেফতার 

১২

আকিজ টেক্সটাইলের পানি যায় আর পুড়ে যায় জমি” আতঙ্কে পুরো গ্রাম

১৩

১৪

মুন্সিগঞ্জের লৌহজং থেকে প্রায় ৩৩ হাজার টাকা মূল্যমানের ১১০ পিস ইয়াবাসহ ০১ জন গ্রেফতার 

১৫

বর্ণিল আয়োজনে শান্তিগঞ্জে বাংলা নববর্ষ উদযাপন

১৬

পহেলা বৈশাখ বাঙালির বাঙালিয়ানা

১৭

শ্রীনগরে আলেমন নেছা প্রিপারেটরি এন্ড হাই স্কুলের এস এস সি ২০২৬ পরীক্ষার্থীদের বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত

১৮

পিরোজপুরে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে বীজ ও সার বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন

১৯

বিনোদপুর সাজুবিবি দাখিল মাদ্রাসা: সাফল্যের আলো ছড়ালেও এমপিওভুক্তির অপেক্ষা শেষ হয়নি

২০

Design & Developed by: BD IT HOST